বুধবার, ৯ নভেম্বর, ২০২২

গল্পঃ বিবাহ বিড়ম্বনা

পাত্র পক্ষের সামনে আমি খুব ভদ্র মেয়ের মতো লুক নিয়ে বসে আছি। মনে মনে খুশিতে লাফাচ্ছি। খুশি হবোই না কেন বলেন? একটি বিয়ে ভাঙতে আমাকে যে কতো কাঠ খড় পোড়াতে হয় সেটা আমিই জানি। কখনো ছেলের মাথার পাকা চুল খুজে বের করে বলতে হয় এই ছেলে বুড়ো হয়ে গেছে।

আমি এই বুড়োকে বিয়ে করবো না।কখনো আবার নিজের বান্ধবীকে পাত্রের প্রাক্তন সাজিয়ে বিয়ে ক্যান্সেল করতে হয়। তবে এইবার ছোটমামা নিজে থেকে বলেছে আমি না চাইলে এই বিয়ে হবে না। মামা নিজ দায়িত্বে বিয়ে ভেঙে দিবে।অবশ্য মামার এত মহৎ হওয়ার কারণটি আমার এখনো অজানা। আসলে আমি এখন বিয়ে করতে চাইছি না। কিন্তু বাবা-মাকে বুঝানো সম্ভব না। তার উপর আজকে আমাকে যে দেখতে এসেছে সে সরকারি চাকরি করে। এই জায়গায় অমত করলে বাবার মাথায় সকাল-বিকেল পানি ঢালতে হবে। অনেক চেষ্টার পরেও এই সমন্ধটি ভাঙতে পারি নি। এখন ছোট মামাই আমার একমাত্র ভরসা। আমাকে জোর করে পাত্র পক্ষের সামনে এনে বসিয়ে দিয়েছে। পছন্দ হলে আজকেই বিয়ে। আমাকে বসানো হয়েছে পাত্রের একদম মুখোমুখি। নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে ভাবলাম বিয়ে হোক বা না হোক পাত্রের চেহারাটি একবার দেখি।পাত্রের দিকে তাকিয়ে আমি তো পুরাই অবাক। পাত্র মশাই আমাকে না দেখে উর্মিকে দেখছে কেনো? উর্মি আমার ফুফাতো বোন। দেখতে আহামরি সুন্দরী না হলেও সুন্দরী বলেই চালিয়ে নেওয়া যায়। উর্মি ঠিক আমার বাম পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি কী ভুল দেখলাম? শিওর হওয়ার জন্য আবার দেখলাম। নাহ্ এই লোক এখনো উর্মির দিকেই তাকিয়ে আছে। ওলে বাবা,আবার হাসছে দেখো।মনে মনে উর্মির চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করলাম। যেভাবে উর্মির দিকে তাকিয়ে আছে। তাকানো দেখে মনে হচ্ছে পারলে উর্মিকে এখনি বিয়ে করে নিবে। প্রচুর হিংসা লাগছে আমার। আমাকে দেখতে এসেছে অথচ ভুল করেও আমার দিকে তাকাচ্ছে না।এটি একটি মেয়ের জন্য ভীষণ অপমানের।মনে মনে ঠিক করলাম এই ছেলেকে বিয়ে করে উচিত শিক্ষা দিবো।এমন সময় পাত্রের বাবা বলল, আপনাদের মেয়েকে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে। আপনারা সম্মতি দিলে কাজি ডেকে এখনি বিয়ের কাজ সেরে ফেলবো। ছোট মামাকে দেখলাম কী যেন বলবে বলবে করেও বলতে পারছে না।তারমানে পাত্র যে উর্মিকে বার বার দেখছে এটি মামার চোখেও পড়েছে।আমার মতামত জানতে চাওয়া হলে মা আমার দিকে ঝুকে আস্তে করে বললো, দেখ মা বিয়েটি সারা জীবনের। তুই ভেবে সিদ্ধান্ত নে। আমি অবাক হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেললাম। আমাকে এইখানে নিয়ে আসার আগেও বলছে বিয়ে এইখানেই দিবে। তাহলে এখন এসব বলছে কেনো?ওহ্ বুঝেছি,ছেলে পক্ষকে দেখাচ্ছে দেখেন আমাদের মেয়ের মতকে আমরা কত গুরুত্ব দেই। পাত্রের দিকে তাকিয়ে দেখি সে এখনো উর্মির দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি রাগের বশে বেশ জোরে করেই বললাম, আমি রাজি। আশ্চর্য যেখানে পাত্রের রিয়েক্ট করার কথা সেখানে রিয়েক্ট করছে আমার মা। মা বাবাকে এক সাইডে ডেকে নিয়ে বললো, এই ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো না। তুমি বিয়ে  ভেঙে দাও।

বাবা মাকে আরো নিচু স্বরে বললো,আমাদের মেয়ে যেখানে রাজি সেখানে তোমার বা আমার সমস্যা থাকার কথা না। ছেলেটি কত ভালো একটি চাকরি করে।আর ছেলে মানুষের এসব সমস্যা কোনো ব্যাপার না। বাবা মা আস্তে  করে কথাগুলো বললেও আমি সব স্পষ্ট শুনতে পেলাম।সবাইকে আরেক দফা মিষ্টি খাওয়ানো হয়ে গেলো।উর্মি আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, পাগলামি বাদ দে রিমা।বিয়েটি করিস না। এখনো সময় আছে বিয়ে ভেঙে দে।

এইটুকু সময়ের মধ্যে উর্মিও দেখি পটে গেছে। দাত চিবিয়ে উর্মিকে জবাব দিলাম, বিয়ে আমি এই ছেলেকেই করবো।বিয়ে না করে এইখান থেকে আমিও উঠবো না।একটু পরে কাজি এসে রেজিস্ট্রির খাতাটি এগিয়ে দিয়ে বললো এইখানে মেয়ের সাইন লাগবে। পাত্রের দিকে তাকিয়ে দেখি এখনো উর্মির দিকেই তাকিয়ে আছে। নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারলাম না। হবু শাশুড়ী মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম আপনার ছেলের মনে হয় আমাকে পছন্দ হয়নি।সেই প্রথম থেকেই দেখছি আমার দিকে না তাকিয়ে শুধু আমার বোনকেই দেখছে। হবু শাশুড়ীমা মুচকি হেসে বলল তুমি ভুল বুঝতাছো।আমার ছেলের তোমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। আসার পর থেকে তোমাকেই দেখতাছে।আসলে আমার ছেলে একটু ট্যারা। 

আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। আমি কোনো ট্যারা ছেলেকে বিয়ে করতে চাই না।চিৎকার দেওয়ার জন্য যেই না মুখ খুলেছি ওমনি উর্মি আমার মুখে আস্ত একটি মিষ্টি ঢুকিয়ে দিয়ে বলল,এতক্ষণ না করছি মানিস নাই।এখন বিয়ে করে পরে উঠবি।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন