বুধবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২২

সোনার নূপুর - সত্যি ঘটনার অবলম্বনে গল্প

আমার বয়স যখন চৌদ্দ বছর ঠিক তখন আমার প্রথম শখ হয় বিয়ে করার। গ্রামের একই স্কুলের দুই বছরের জুনিয়র একজন বারো বছরের মেয়েকে আমার ভালোও লাগলো। ফর্সা, কোঁকড়া চুল, খাড়া নাক, গোলাপি ঠোঁট শুধু সামনের একটি দাঁত ছিল উঁচু।  কিন্তু সে বেশ চমৎকার দেখতে ! আমার ভালো লাগার কথা আমি আমার প্রিয় বন্ধু মেহেদী ছাড়া আর কাউকে জানালাম না। মেহেদীর কথা মতো মেয়েটির ইসলাম শিক্ষা বইতে আমি একদিন একটি চিরকুটে লিখে দিলাম, “আমি একটি পাপ করে ফেলেছি। তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। এখন পাপ কাটিয়ে তোমাকে বিবাহ করতে চাই।”  

মেয়েটি চিঠিটি পেল প্রায় তিনদিন পর।  কারণ, সে তিনদিনে ইসলাম শিক্ষা বই খোলেনি। তিনদিনে কোনো উত্তর না পেয়ে আমি এবং আমার বন্ধু মেহেদী দুজনেই তো অস্থির।  সে যাই হোক, যে দিন সে চিঠিটা পেল সেদিন সে চোখ লাল করে স্কুলে আসলো। সম্ভবত এটিই মেয়েটির লাইফে পাওয়া প্রথম চিঠি, তাই হয়ত রাত জেগে কান্নাকাটি করার কারণে তার চোখ লাল হয়ে গেল। তারপর মেয়েটির সঙ্গে আমার দেখা হয় টিফিন পিরিয়ডে। সে তার বান্ধবীকে বলে স্কুলের পিছনের দিকে আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলো। আমিও রাজি হলাম। 

মেয়েটি আমাকে দেখেই বলল, “আপনি আমারে ভালোবাসেন?”

আমি তাকে বললাম, “হ বাসি।”

“আপনি জানেন হেড স্যারের কাছে আমি নালিশ করলে আপনের কী অবস্থা হইবো?”

“জানমু না কেন? পিডাইতে পিডাইতে আমাকে ক্লাসরুম থেকে মেইন রাস্তায় নিবো।”

“তারপরও আমারে ভালোবাসেন?”

“শুধু ভালোবাসি না। বিয়েও করতে চাই।” 

নিপা বলল, “আমার এখনো বিয়ের বয়স হয় নাই। আঠারো বছরের আগে মাইয়্যাগো বিয়া দেওন যায় না।  আপনেরও একুশ বছর হওন লাগব।”

“তাইলে আমার একুশ আর তোমার আঠারো হইলে তখন বিয়ে করমু।”

“সত্যি বিয়ে করবেন?”

“হ করমু।”

“কথা দেন।”

“কথা দিলাম।”

আমি কথা দেয়ার পর মেয়েটি কান্না করে দিল। সে কেন কাঁদলো বুঝতে পারলাম না। কাঁদতে কাঁদতে সে ক্লাসরুমে গেল। এরপর আমার বন্ধু মেহেদী আর নিপাদের বাড়ি পাশাপাশি হওয়ায় বন্ধুর মাধ্যমে আমাদের ভেতর চিঠির আদানপ্রদান চলতে লাগলো। এভাবে আমাদের ভালোবাসার একবছর কেটে গেল।

একবছরের মধ্যে আশেপাশের গ্রামের এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি আমাদের প্রেমের খবর ছড়িয়ে পড়ল। দুষ্ট ছেলেমেয়েরা গাছে গাছে লাভ চিহ্ন একে তারমধ্যে (শাকিল + নিপা) লিখে রাখতো। আমাকে দেখলে ‘নিপা’ ‘নিপা’ করতো, আবার নিপাকে দেখলে ‘শাকিল’ ‘শাকিল’ বলে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা দৌড় দিত। স্কুলের এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিপা নাচলো। নাচের গান ছিল, ‘বৃষ্টি পরে টাপুর টুপুর, পায়ে দিয়ে সোনার নূপুর।’  এই নাচ দেখে আমার ইচ্ছে হলো, নিপাকে এক জোড়া সোনার নূপুর কিনে দেবো। সত্যি সত্যি সেই সোনার নুপুর পরে নিপা নাচবে। আমি আব্বার পকেট থেকে টাকা চুরি করে নূপুর কেনার টাকা জমাতে লাগলাম। সময় চলে যায় টাকার পরিমাণ বাড়ে কিন্তু সোনা কেনার মতো টাকা জোগাড় হয় না। 

এদিকে নিপা আমার জন্য একটি সবুজ রুমালে ফুলের আলপনা একে লিখে ফেলল, ‘ভুলো না আমায়।’ সেই রুমাল আর একটি ঈদ কার্ড পেয়ে আমার কিশোর বয়সের অবুঝ মনে চোখে জল চলে এলো।  কিন্তু আমাদের এই অশ্রুজলের মধুর ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। নিপার জন্য সোনার নূপুর কেনার আগেই বাবা আমাকে মানচিত্রের অপর প্রান্তের নতুন শহরের স্কুলে ক্লাস নাইনে ভর্তি করে দিলেন। সেই শহরে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়ে নতুন বন্ধু বান্ধবী পেয়ে আমি নিপাসহ পুরোনো গ্রামের বন্ধুদের ভুলে গেলাম।  তখন মোবাইলের ব্যবহার এখনকারমতো না থাকায় যোগাযোগটিও আর হয়ে উঠেনি। 

তারপর নয় বছর কেটে যায়। 

হঠাৎ আম্মার এক কাজে তার সঙ্গে একবার জুয়েলার্সের দোকানে গিয়ে একজোড়া সোনার নূপুর দেখে আমার নিপার কথা মনে পড়ে।  আম্মু এত বছরে কয়েকবার বাড়িতে গেলেও আমি কখনো যাইনি। নিপার কথা জিজ্ঞেস করলে সে চিন্তেও পারেনি।

অনেক ঝামেলা করে আমি গ্রামের বাড়িতে খোঁজ করে জানতে পারি নিপার বিয়ে হয়ে যায় আরো পাঁচ বছর আগে। এখন তার ছেলেমেয়েও আছে। আমার ততদিনে চার নম্বর রিলেশনের ব্রেকাপ হওয়ার কারনে মন খুব খারাপ ছিল। পড়াশুনা আর চাকরিতে সাকসেসফুল হলেও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি আমার এক ধরনের অনীহা জন্ম নিয়েছিল।  আমি আমার বাবা-মাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঘুরতে যাই। 

নিপা কোথায় থাকে সেটি বের করতে বেশি কষ্ট হয়নি কেননা সে আমার ছোটবেলার বেস্টফ্রেন্ড মেহেদী কে বিয়ে করেছে। নিপার বিয়ে হয়েছে সেটি শোনার চেয়ে আমার একসময়ের বেস্ট ফ্রেন্ডকে সে বিয়ে করেছে সেটি শুনে আমি বেশি কষ্ট পাই। কেন কষ্ট পাই, কীসের জন্য পাই সেটি আমি বুঝতে পারি না। তবে আমি গ্রামে এসেছি শুনে তারা ভীষণ খুশি হয় এবং তাদের অনুরোধেই তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাই। দেখা হওয়ার পর আমি তাদের সঙ্গে এমনভাব করি যেন ছেলেবেলার কিছুই আমার মনে নেই। 

নয় বছরে নিপা যেন আরো সুন্দরী হয়ে গিয়েছে আর মেহেদী তখন গ্রামের সুদর্শন যুবক। টাকাপয়সা না থাকলেও তাদের ছোট্ট খড়কুটোর ঘরে এত ভালোবাসা দেখে আমার হিংসে হয়। হঠাৎ আমার মনে হয় আমি নিপাকে ছেড়ে না গেলে আমি মেহেদীর জায়গায় থাকতাম আর নিপাকে নিয়ে এমনটিই সুখে থাকতে পারতাম। আমি তাদের ছোট ছোট দুটো ছেলেমেয়ের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকি। 

এত সুন্দর ওরা বাড়ির উঠানে ছোটাছুটি করছে। নিপা আমাকে দেখে প্রথমে অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও পরে খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করে। রাতে খাওয়াদাওয়া করে আমি খুব দ্রুতই শহরের উদ্দেশ্য রওনা দেই। ওরা অনেক করে থাকতে বললেও আমার অবচেতন মনে এক চাপা ব্যথার কারণে থাকতে চাই না। হারিকেন হাতে মেহেদী  এবং নিপা আমাকে গঞ্জের অনেকটি পথ এগিয়ে দেয়। আমার খুব কষ্ট হয়। আমার প্রথম ভালোবাসা আমি ধরে রাখতে পারিনি সেই অনুশোচনা আমাকে সারাটি পথ যন্ত্রণা দেয়। সবথেকে বেশি যন্ত্রণা দেয়, নিপার পায়ে একজোড়া রুপার নুপুর দেখে। আমি যে নিপাকে সোনার নুপুর কিনে দিতে চেয়েছিলাম এই কথাটি মেহেদী ছাড়া আর কেউ জানতো না। সোনার না হোক রুপার একজোড়া নুপুর সে নিপাকে ঠিকই কিনে দিয়েছে।  আমি পারিনি, আর কখনো পারবো না। সেই অধিকার আমার হবে না। 

লিখেছেন: শাদবিন শাকিল 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন