আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছি। আমার চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে, মুখটা শুকিয়ে গেছে। সাজগোজ করেও আমার মুখের লাবণ্যতা ফেরেনি।
তারপর বাবার অলক্ষণে পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে পড়ি। অবশ্যই আমার মা আর ছোট ফুপু দেখছে, কিন্তু তারা কিছু বলেনি। তারা জানে আমি ওদের অসম্মান হোক এমন কিছু করবো না।
পরিবারের কেউ অতীতে ভুল করলে সে ভুলের মাশুল বর্তমানেও কাউকে না কাউকে দিতেই হয়। আর সে বর্তমান হলাম আমি।
আজ শেষবারের মতো রওনকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে আসবো। রওনক জানে কিন্তু বেচারা অনেক চেষ্টা করেও বাবাকে রাজি করাতে পারেনি। এ মানুষটিকে হয়তো আর কোনদিন দেখবো না। তাই আজকে তাকে শেষ দেখা দেখে আসবো।
আমার ছোট ফুপু ভুল বয়সে ভুল মানুষকে ভালবেসে বাসা হতে পালিয়ে যায়। কিন্তু তার কয়েক মাস পর ফুপু বিধ্বস্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসে। ফুপুর গায়ে মাইরের অনেক দাগ। ফুপা
মাতাল হয়ে ফুপুকে মারধর করতো।
ফুপু দাদু আর বাবার হাতে পায়ে ধরে বাড়িতে আশ্রয় নেয়, আর কখনো ফুপার কাছে ফিরে যায়নি এমন কি বিয়েও করেনি।
ফুপুর এ অবস্থা দেখে দাদু আর বাবা ধরে নিয়েছে আমার সঙ্গেও এমন হবে। যেহেতু আমিও প্রেম করে বিয়ে করবো বলছি। তার থেকেও বড়ো কথা রওনকের বাবা নেই, মা আর দুই বোন, এক বোনের বিয়ে দিয়েছে। রওনক এখনো ভাল কোন জব করে না। তাইতো নিজেরদের পছন্দের ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করছে।
রওনক বাবা আর দাদুকে অনেক ভাবে বুঝিয়েছে। কিন্তু বাবা তার কথায় অনড়। ফুপুর ভুলের কারণে আজ আমাদের চার বছরে ভালোবাসার সমাপ্তি ঘটবে।
রিক্সাওয়ালার ডাকে ভাবনা হতে বেরিয়ে আসি, রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি রওনক বসে আছে। ওকে দেখে আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে। এই মানুষটিকে আর কখনো হয়তো দেখবো না। ওর কথা শুনবো না, ভুবন ভুলানো হাসি দেখবো না। কলিজা বলে ডাকটা শুনবো না।
চোখের কোনে পানি চলে আসে, নিজেকে সামলে নিই। ওর সামনে দুর্বল হওয়া যাবে না।
আমাকে দেখে রওনক চেয়ার টেনে দেয়, বসতে বলে, তারপর দুই কাপ কফির অর্ডার করে। আমাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে রওনক কথা শুরু করে,
- স্নেহা একি অবস্থা করছো শরীরের? তোমাকে এরকম দেখতে আমার ভাল লাগছে বল? ভেবে নাও এটাই আমাদের নিয়তি, এ পর্যন্ত আমাদের পথচলা। উপরওয়ালা আমাদের জোড়া বেঁধে রাখেননি, যদি বেঁধে রাখতেন শত বাঁধার পরেও আমরা এক হতাম। বাবা-মারা সন্তানের খারাপ চায় না। তারপর অতীতের ভুলটি তো আছেই। আমি চাইবো তুমি সুন্দর করে সংসার করবে, স্বামীকে ভালবাসবে, নিজের শরীরের যত্ন নিবে। রওনক নামের কেউ তোমার জীবনে ছিল সেটি না মনে রাখলে ভাল হবে।
আমি রওনকের কথা শুনে অবাক হয়ে বলি
- এতই সহজ!!
- সহজ করে নিলে সব সহজ। আমি কখনো তোমার খারাপ চাইবো না। আমি তো অনেক চেষ্টা করছি। আমাদের সঙ্গে তোমাদের যায় না। তারপরেও আমি কম চেষ্টা করিনি, আরও আমরা রিলেশনে গেছি, এটিও একটি বড়ো কারণ। এখন শুধু একটিই পথ খোলা আছে আর সেটি হল পালিয়ে যাওয়া।কিন্তু এরকমটি আমরা কখনোই করবো না। বাবা-মা পরিবারের অসম্মান হোক আমরা কখনো চাইবো না।
শেষ কথাগুলি বলতে বলতে রওনকের গলা ধরে আসে।
আমি রওনকের আর কোনো কথা না শুনে উঠে চলে আসি। এখানে থাকলে আমি আরও পাগল হয়ে যাবো। উঠে আসার সময় খুব করে ইচ্ছে করছিল প্রথম এবং শেষবারের মতো রওনককে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের ইচ্ছেটিকে ধমন করে রেস্টুরেন্ট হতে বের হয়ে আসি। রওনক পিছন হতে ডাকতে ডাকতে বের হয়ে আসে, আমি ও কাছে আসার আগে রিক্সায় চড়ে বসি।
বাড়িতে এসে নিজেকে একেবারে ঘর বন্ধ করে রাখি। মা কোন রকমে দুই এক লোকমা খাইয়ে দেয়। ঠিকঠাক ঘুমও হচ্ছে না, চোখের নিচে কালি জমে গেছে। যে মেয়েটি সারাদিন বাড়িতে মাতিয়ে রাখি সে আমি আজ কারোর সঙ্গে কথা বলতেও ইচ্ছা করে না। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ চলে যায়, আজ না-কি আমাকে দেখতে আসবে।
আমি নিজেকে সামলে তৈরী হয়ে নিই, এভাবে থাকলেও তো বিয়েটি হবে, না থাকলেও বিয়েটি করতে হবে। তাই নিজের মনে নিজেকে শক্ত করে নিই।
নিচের দিকে তাকিয়ে বসার ঘরে যাই সালাম দিয়ে একটি সোফায় বসি।
মহিলাটি একটি আর মেয়ে দুইটার কথা শুনা যাচ্ছে। ওদের কথাবার্তা কেমন যেনো চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু রাগ করে তাকাচ্ছি না।
একটু পর সদর দরজা দিয়ে একজন ঢুকতে ঢুকতে সালাম দেয়। সালামের আওয়াজটি চেনা মনে হতে তাকিয়ে দেখি সে আর কেউ না রওনক!!
রওনককে দেখে সামনে তাকিয়ে দেখি এতোক্ষণ রওনকের মা,বোনরা কথা বলছিল। তাইতো বলি চেনা চেনা কন্ঠ।
আমি অবাক আর খুশির সংমিশ্রণে বাবার দিকে তাকালে দেখি বাবা আর দাদু হাসতেছে।
বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
- সব বাবারা তার মেয়েদের কাছে সুপার হিরো, আমিও আমার মেয়ের কাছে সুপার হিরো ছিলাম। কিন্তু ইদানিং আমার মেয়েটি আমাকে ভিলেন ভাবতে শুরু করছে। আমি বাবা হয়ে কী করে সহ্য করবো বল। তাই রওনকের ব্যপারে আরও খোঁজ খবর নিলাম, ছেলেটি আবারও আমার কাছে এসে খুব করে তোকে চাইল। ওর চাওয়াতে এমন কিছু ছিল আমি আর না করতে পারিনি। শেষে না আমার মেয়েটি অসুখি হয়। তাইতো আজ ওদেরকে এখানে আসতে বলছি। আমার শুধু একটিই চাওয়া তুই সুখি হও মা ।
আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকি।
রওনক ঠিকেই বলছে "উপরওয়ালা জোড়া বেঁধে রাখলে কারোর ক্ষমতা নেই সে জোড়াকে আলাদা করার" যদি সম্পর্কের বাঁধনটা শক্ত থাকে।
লিখেছেন: জিনাত আফরোজ

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন